বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে আজকের এই তারিখ। দীর্ঘ দেড় দশকের আইনি লড়াই, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সাংবিধানিক বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে।
প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আপিল বিভাগ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, নির্বাচনকালীন এই নির্দলীয় ব্যবস্থাটি আসন্ন চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই কার্যকর হবে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
তবে আদালত একটি নমনীয় জায়গাও রেখেছে। আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, বর্তমান সংসদ যদি মনে করে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এই ব্যবস্থার কোনো সংযোজন, বিয়োজন বা পরিমার্জন প্রয়োজন, তবে তারা তা করার এখতিয়ার রাখে। অর্থাৎ, আইনি কাঠামোটি আদালত দিলেও তার চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণের সুযোগ থাকছে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতেই।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ইতিহাস বাংলাদেশের গণতন্ত্রের চড়াই-উতরাইয়ের গল্পের মতো। গণদাবির মুখে তৎকালীন বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা প্রবর্তন করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের তৎকালীন আপিল বিভাগ এক বিতর্কিত রায়ের মাধ্যমে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা করে। এর ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ ঘটে এবং দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসলে ২০১১ সালের সেই রায় পুনর্বিবেচনার (Review) আবেদন করা হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগ আগের রায়কে অবৈধ ঘোষণা করে নির্দলীয় ব্যবস্থা পুনর্বহালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়।
রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন বিএনপির সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘এই রায় কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়, এটি পুরো বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের ভোটাধিকার আদায়ের লড়াইয়ের জয়। এটি একটি জাতীয় মাইলফলক।’
আইনজীবীরা তাদের বক্তব্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের কঠোর সমালোচনা করেন। তাদের দাবি, ২০১১ সালে বিচারপতি খায়রুল হক রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে এবং তৎকালীন সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এই জনবান্ধব ব্যবস্থাটি বাতিল করেছিলেন, যা দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। আজকের এই পূর্ণাঙ্গ রায় সেই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের একটি দলিল।
এই ঐতিহাসিক রায়টি প্রদান করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ। বেঞ্চের অন্য সম্মানিত সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম ইমদাদুল হক, বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুব।
বিচারপতিদের ঐক্যমত্যের ভিত্তিতেই এই রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে সাব্যস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই রায়ের ফলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে যে অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়েছিল, তা এই রায়ের ফলে ভেঙে যাবে। সাধারণ ভোটারদের মধ্যে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে যে, তাদের ভোট অন্তত ছিনতাই হবে না।
তারা বলেন, ‘সংবিধান জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। যখন কোনো আইনি ব্যাখ্যা জনগণের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী হয়, তখন আদালতকে তা সংশোধন করতেই হয়। আজকের এই রায় সেই সত্যকেই প্রতিষ্ঠিত করল।‘
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর এখন মূল দায়িত্ব বর্তাচ্ছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের ওপর। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী চতুর্দশ নির্বাচনের আগে এই ব্যবস্থার আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড় করানো এখন সময়ের দাবি। সংসদ যদি এতে কোনো পরিবর্তন আনতে চায়, তবে তাও দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, ১৫ মার্চের এই রৌদ্রোজ্জ্বল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট থেকে আসা ৭৪ পৃষ্ঠার এই বার্তাটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
মন্তব্য করুন